নির্বাচনকালীন সময়ে দায়িত্বশীল, বস্তুনিষ্ঠ ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, শিকারী ও দালাল সাংবাদিকতা দেশের অর্জনকে বার বার ম্লান করেছে। এখন আবারও বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ তৈরির অপচেষ্টা শুরু হয়েছে। যা গণতন্ত্র ও নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
বুধবার সকালে কক্সবাজার জেলা পরিষদ মিলনায়তনে পিআইবি আয়োজিত নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতা বিষয়ক দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ফারুক ওয়াসিফ বলেন, কক্সবাজার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক অঞ্চল। বহু সভ্যতার সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান- দুটিই এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে অর্জিত। এসব অর্জন রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জনের ভেতরে কৌশলে ঢুকে পড়েছে ফ্যাসিবাদের দোসররা। অতীতেও শিকারী সাংবাদিকতা জঙ্গিবাদী ন্যারেটিভ তৈরি করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নির্যাতনের পথ প্রশস্ত করেছে। এখনও একই ধরনের অপতৎপরতা নতুন করে শুরু হয়েছে, যা দেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
আশঙ্কা প্রকাশ করে পিআইবি মহাপরিচালক বলেন, ‘হাসিনা না ফিরলেও ফ্যাসিবাদ কি আমরা সত্যিই রুখতে পারব? আবার কি দালাল সাংবাদিকতার উত্থান ঘটছে- এই প্রশ্ন এখন সামনে চলে এসেছে।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ সবসময় জমিদারি কায়দায় জেঁকে বসে। সাংবাদিকরা যখন কথা বলেন না, তখনই ফ্যাসিবাদ শক্তিশালী হয়।’ তিনি উল্লেখ করেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে উপস্থিত সাংবাদিকদের কেউই ভোট দিতে পারেননি- এটি আমাদের গণতান্ত্রিক বাস্তবতার একটি করুণ চিত্র।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল বিপ্লব, সংস্কার এবং ফ্যাসিবাদের বিদায়। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে সেই চেতনাকে দুর্বল ও বিভক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। সারাদেশে নির্বাচনী উৎসবের আবহ থাকলেও জুলাইয়ের শহীদরা আহতরা আজ উপেক্ষিত- এটি লজ্জাজনক। অথচ সেই শহীদ ও আহতরাই ছিল জুলাই আন্দোলনের মূল প্রেরণা।
বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফারুক ওয়াসিফ বলেন, আমরা এমন এক রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ে নির্বাচন ও গণভোটের দিকে যাচ্ছি, যা মূলত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে তৈরি। এই কাঠামো দিয়ে কতটা সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব- তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন ও গণভোটে অংশগ্রহণকারী অনেকেই জুলাই সনদ সম্পর্কে সচেতন নন। এমনকি ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ বাদ যাবে- এমন অপপ্রচারও চালানো হচ্ছে।
সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংস্কার একদিনে সম্ভব নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। পাশাপাশি ‘মব’ শব্দকে ঘিরে বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্র চলছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সবশেষে ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ‘সমাজ ও রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালনায় সাংবাদিকদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে। এই প্রশিক্ষণ কর্মশালা সেই প্রচেষ্টারই অংশ।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার শতাধিক সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন। দুই দিনব্যাপী এই কর্মশালায় নির্বাচনকালীন রিপোর্টিং, নৈতিকতা, ফ্যাক্টচেকিং ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী ও কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারী।
প্রশিক্ষণ সমন্বয়ক হিসেবে রয়েছেন পিআইবির প্রশিক্ষক সাহানোয়ার সাইদ শাহীন।
কক্সবাজার প্রতিনিধি 


















