কক্সবাজার জেলায় সম্প্রতি Measles (হাম) রোগের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা অল্প সময়ের মধ্যেই এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে।
কক্সবাজার জেলায় Measles (হাম) রোগের বিস্তারের পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো টিকাদানে ঘাটতি। অনেক শিশু এখনো নিয়মিত এমআর/এমএমআর টিকার আওতায় আসেনি, বিশেষ করে দুর্গম ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম পুরোপুরি পৌঁছাতে না পারায় ঝুঁকি বেড়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মানুষের নিবিড় বসবাস ভাইরাসটির দ্রুত সংক্রমণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
এছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবও একটি বড় কারণ। অনেক অভিভাবক হামকে সাধারণ জ্বর বা হালকা রোগ হিসেবে বিবেচনা করেন, ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নেওয়া বা আক্রান্তকে আলাদা রাখার বিষয়ে অবহেলা দেখা যায়। এর সঙ্গে শিশুদের অপুষ্টি পরিস্থিতি যুক্ত হয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায় এবং জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভাব, যেমন কাশি-হাঁচির শিষ্টাচার না মানা বা নিয়মিত হাত না ধোয়া, সংক্রমণ বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার কারণে পরিবার ও আশপাশের মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তদুপরি, কক্সবাজার একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন এলাকা হওয়ায় দেশ-বিদেশ থেকে মানুষের নিয়মিত আগমন ঘটে, যা সংক্রমণ বিস্তারের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এই সকল কারণ মিলেই বর্তমানে কক্সবাজারে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে।
Measles (হাম) রোগের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে হলে সমন্বিতভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। সর্বপ্রথম নিশ্চিত করতে হবে শিশুদের পূর্ণাঙ্গ টিকাদান, কারণ হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এমআর/এমএমআর টিকা গ্রহণ। একইসঙ্গে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে এবং কোনো শিশুর জ্বর, কাশি বা ফুসকুড়ির মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।
এছাড়া ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা এবং ব্যবহৃত কাপড় বা রুমাল পরিষ্কার রাখা উচিত। ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখা ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। শিশুদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ সুস্থ দেহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি ভিড় এড়িয়ে চলা, বিশেষ করে সংক্রমণ বেশি থাকলে জনসমাগমে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সর্বোপরি, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার মাধ্যমে সম্মিলিত সচেতনতা গড়ে তুললেই হাম রোগের সংক্রমণ কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
লেখক, মাহাবুব কাউসার, উন্নয়নকর্মী।
মাহাবুব কাউসার 








