ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকারি দলের আসনে এবং বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। এ দুই রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীদের বাইরে নির্বাচিতদের মধ্যে আছেন জোট, স্বতন্ত্র, আর দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করা বিদ্রোহী প্রার্থীরাও। এই সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৭৯টি আসনে বিএনপির সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে দলটির নেতারা স্বতন্ত্র বা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে লড়েছেন। এর ফলে বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে কিছু আসন হারিয়েছে বিএনপি। সুযোগ নিয়েছে জামায়াত জোট।
নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে হাঁস প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছেন আলোচিত নারী প্রার্থী রুমিন ফারহানা। নিজ দল বিএনপির কাছ থেকে মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরে দল থেকে তাকে বহিষ্কারও করা হয়। নির্বাচনে রুমিন ফারহানা পেয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট। তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জুনায়েদ আল হাবিবের চেয়ে ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোট বেশি পেয়েছেন। জুনায়েদ বিএনপির জোট শরিক জমিয়তে উলামায়ের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পেয়েছেন ৮০ হাজার ৮৩৪ ভোট।
দিনাজপুর-৫ আসন থেকে তালা প্রতীক নিয়ে জয়ী হয়েছেন আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী এ. জেড এম রেজওয়ানুল হক। বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ান তিনি। পেয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৫০ ভোট। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শাপলাকলি প্রতীকে নির্বাচন করা মো. আব্দুল আহাদ পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৯৪৮ ভোট।
ময়মনসিংহ-১ আসনে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে জয়ী হয়েছেন মোহাম্মদ সালমান ওমর। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ২৪১ ভোট। তিনিও বিএনপি থেকে মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র ভোট করেন। তাকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সৈয়দ এমরান সালেহ পেয়েছেন ১ লাখ ৭৩৬ ভোট।
হাঁস প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। তিনি পেয়েছেন ৭৯ হাজার ২১০ ভোট। এই আসনে শুরুতে বিএনপির মনোনয়ন পান তিনি। পরে চূড়ান্তভাবে ধানের শীষ দেওয়া হয় সৈয়দ এহসানুল হুদাকে, যিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পেয়েছেন ৬৬ হাজার ১১৮ ভোট। মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে ইকবালকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
কুমিল্লা-৭ আসনে জয়ী হয়েছেন কলস প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা স্বতন্ত্র প্রার্থী আতিকুল আলম। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ পান। মনোনয়ন না পেয়ে আলম বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র ভোটে দাঁড়ালে দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি পেয়েছেন ৯১ হাজার ৬৯০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির রেদোয়ান আহমেদ পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৫০৯ ভোট।
চিংড়ি প্রতীক নিয়ে চাঁদপুর-৪ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আবদুল হান্নান। পেয়েছেন ৭৩ হাজার ৫৯৯ ভোট। তিনিও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মো. হারুনুর রশিদ পেয়েছেন ৬৭ হাজার ৮৩৩ ভোট।
টাঙ্গাইল-৩ আসনে মোটরসাইকেল প্রতীক নিয়ে বিএনপির বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. লুৎফর রহমান খান আজাদ। তিনি পেয়েছন ১ লাখ ৭ হাজার ৯০১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির এস এম ওবায়দুল হক পেয়েছেন ৮২ হাজার ৭৬৯ ভোট।
এছাড়া বরগুনা-১ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের মনোনীত হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. অলি উল্লাহ। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫১০ ভোট। আর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মো. নজরুল ইসলাম মোল্লা পেয়েছেন ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৩৭ ভোট।
বিএনপির সাথে থাকা মিত্র দলের তিন প্রার্থী
পটুয়াখালী-৩ আসনে জয়ী হয়েছেন বিএনপি জোটে থাকা গণঅধিকার পরিষদের মো. নুরুল হক। ট্রাক প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা এই প্রার্থী পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৩২৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. হাসান মামুন। তিনি পেয়েছেন ৮১ হাজার ৩৬১ ভোট।
ভোলা-১ আসনে জয়ী হয়েছেন একই জোটের প্রার্থী আন্দালিভ রহমান। গরুর গাড়ি প্রতীক নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি থেকে নির্বাচনে দাঁড়ানো এই প্রার্থী পেয়েছেন ৪ লাখ ৬ হাজার ৫৬৭ ভোট। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মো. নজরুল ইসলাম পেয়েছেন ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪৭৫ ভোট।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে জয়ী হয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। মাথাল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এই প্রার্থী পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৩৪২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মো. মহসীন পেয়েছেন ৩৯ হাজার ৯৬৭ ভোট।
জামায়াত জোটের জয়ী প্রার্থীরা
রংপুর-৪ আসন থেকে শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে জয়ী হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী আখতার হোসেন। জামায়াতে ইসলামীর সাথে আসন সমঝোতা করা দলটির এই প্রার্থী পেয়েছেন ৫ লাখ ৯ হাজার ৯০৫ ভোট। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি থেকে নির্বাচন করা মোহাম্মদ এমদাদুল হক ভরসা পেয়েছেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট।
কুমিল্লা-৪ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা দলটির প্রার্থী মো. আবুল হাসনাত পেয়েছেন ১ লাখ ৬৬ হাজার ৫৮৩ ভোট। গণঅধিকার পরিষদ থেকে নির্বাচন করা তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. আ. জসিম উদ্দিন পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৮৮৫ ভোট।
একই দল থেকে ঢাকা-১১ আসনে জয়ী হয়েছেন নাহিদ ইসলাম। তিনি পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৮৭২ ভোট। বিএনপি থেকে নির্বাচন করে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এম এ কাইয়ুম পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৩৩ ভোট।
কুড়িগ্রাম-২ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন এনসিপির প্রার্থী আতিকুর রহমান মোজাহিদ। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৭৮ হাজার ৮৬৯ ভোট। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মো. সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ পেয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৩৫ ভোট।
নোয়াখালী-৬ আসনে জিতেছেন আবদুল হান্নান মাসউদ। তিনি পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৯৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মোহাম্মদ মাহবুবের রহমান পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২১ ভোট।
দলটির আরেক প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন ভোট করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে। পেয়েছেন ১ লাখ ০৬ হাজার ১৭১ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মনির হোসাইন খেজুরগাছ প্রতীক নিয়ে পেয়েছন ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট।
জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতায় যাওয়া আরেক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদুল্লাহ ময়মনসিংহ-২ আসন থেকে রিকশা প্রতীক নিয়ে জয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মোতাহার হোসেন তালুকদার পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৪৪ ভোট।
দলটি থেকে মাদারীপুর-১ আসনে জয়ী হয়েছেন সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা। ৬৪ হাজার ৯০৯ ভোট নিয়ে জয়ী হয়েছেন তিনি। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নাদিরা আক্তার পেয়েছেন ৬৪ হাজার ৫২৪ ভোট।
সিলেট-৫ আসনে জয়ী হয়েছেন খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ আবুল হাসান। দেওয়াল ঘড়ি নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়া এই প্রার্থী পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট। আসনটিতে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের উবায়দুল্লাহ ফারুক পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণভোটের ফলাফলের গেজেট এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৭ আসনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের সরকারি ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ করে ইসি। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী চট্টগ্রামের দুটি আসনের ফলাফল পরে দেওয়া হবে। আর জামায়াতের প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে আগেই। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) উৎসবমুখর পরিবেশে সারা দেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে একযোগে চলে ভোটগ্রহণ। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি এদিন দেশজুড়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়।
নিজস্ব প্রতিনিধি 
















